আসসালামু আলাইকুম সুপ্রিয় দর্শক শুভেচ্ছা রইল। বিশ্বব্যাপী এক ভয়ানক অর্থনৈতিক মন্দা অপেক্ষা করছে আমাদের সামনে। ২০০৩ সাল যে এখন বরণের অপেক্ষামাত্র। তবে তা কোন সুসংবাদ দিয়ে নয় বরং আত্মা চমকে যাওয়ার মতো এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে আমরা। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা যে আগামী বছর মারাত্মক হতে পারে তেমন আশঙ্কা শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে একা করেছেন তেমন নয়। বিশ্বের অনেক নামিদামি অর্থনীতিবিদ এবং আর্থিক খাতির বিশ্লেষক ও একই ধরনের আশঙ্কা ব্যক্ত করে আসছেন অনেক আগে থেকেই।
![]() |
| ২০২৩ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা |
২০২৩ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা
কিন্তু এই মন্দার বিষয়টি পশ্চিমা বিশ্বের মিডিয়া এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে সেভাবে আলোচনায় আসেনি। কিছু মিডিয়ায় শুধু উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কথাই প্রচার করা হয়। এবারের অর্থনৈতিক মন্দার পেছনে আছে রাজনৈতিক কারণ ফলে এবারের মন্দার ধরন একটু ভিন্ন সাধারণত তিনটি খাতের অর্থ গতি দিয়ে এখানকার অর্থনৈতিক মন্দা বিচার করা হয়ে থাকে। প্রথমত উচ্চ বেকারত্বের হার। দ্বিতীয়ত বাড়ির মূল্যের অস্বাভাবিক দর পতন এবং শেয়ার মার্কেটে ধস এক রহস্য জনক কারণে এই তিনটি খাতে এখনো সেভাবে খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হয়নি। এখনো সেভাবে চাকরিচ্যুতি শুরু হয়নি।
যদিও Facebook এবং google সহ অনেক বড় কোম্পানি কর্মী ছাঁটাই করার ঘোষণা দিয়েছে এবং ছাটাই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। যা আগামী বছর সবচেয়ে খারাপ আকার ধারণ করতে পারে। ক্রমাগত সুদের হার বৃদ্ধির কারণে বাড়ির মূল্যে কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করলেও সেভাবে দর পতনের ঘটনা এখনো ঘটেনি। বাড়ির মূল্যে ধস না নামলেও সেই অবস্থাও যে আগামী বছর নাগাদ সৃষ্টি হতে পারে তা বেশ আঁচ করা যায়। কারণ একদিকে চাকরিচ্যুতির ঘটনা এবং অন্যদিকে উচ্চ সুদের হারের কারণে অনেকের ব্যাংক ঋণ নবায়ন করা সম্ভব হবে না।
ফলে এর সমষ্টিগত প্রভাবে বাড়ির মূল্যে বড় ধরনের দর পতন হওয়া স্বাভাবিক। আর স্টক মার্কেট এর কথা আলোচনা না করাই ভালো কেননা এখন শেয়ার ইনডেক্স আর অর্থনীতির উত্থান পতনের ব্যারোমিটার হিসেবে কাজ করে না। এই মার্কেট যে কখন কিভাবে ওঠানামা করে তা কোন বিশ্লেষণেই ধরা পড়ে না। যখন মার্কেট বাড়ার কথা তখন কমে আবার যখন কমার কথা তখন বাড়ে। যেমন করোনা মহামারীর সময় বিশ্ব যখন প্রায় থমকেছিল তখন পশ্চিমা বিশ্বের স্টক মার্কেট প্রথমে কিছুটা কমে পড়ে রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
আবার বর্তমানের চতুর্দিকে মন্দা অবস্থা বিরাজ করছে এবং দ্রব্যমূলের ঊর্ধ্বগতির কারণে মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার ফলে সব কোম্পানি তাদের ভবিষ্যৎ লোভ্যাংশ হ্রাস করেছে। এমন পরিস্থিতিতে স্টক মার্কেটে স্বাভাবিক নিয়মে দর পতন হওয়ার কথা কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় কখনো শেয়ার বাজার অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বমুখী আবার কখনো নিম্নমুখী। আসলে শেয়ার বাজার এখন কিছু ফান্ড ম্যানেজার ভেজ ফান্ড এবং বিশ্বের এক শতাংশ অতি ধন্যাট্য ব্যক্তির দখলে রয়েছে। তাই এখানে আর শেয়ার বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম কাজ করে না। স্টক মার্কেটের গতিবিধিকে এখন আর অর্থনৈতিক উত্থান পতনের ব্যারোমিটার হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
অর্থনৈতিক মন্দার ভয়াবহতা
আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে দ্রব্যমূলের উর্ধ্বগতির নেতিবাচক প্রভাব হাউজিং মার্কেটের পতন এবং চাকরিচ্যুতির প্রভাবে আগামী বছর স্টক মার্কেটে দরপতন হতে বাধ্য। অর্থনীতির এসব মৌলিক বিষয় বিবেচনা করলে আগামী বছর আসলেই ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক মন্দার বছর হবে বলেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী তার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। একই আশঙ্কা ব্যক্ত করছেন বিশিষ্ট জনরা।
আর এই আশঙ্কা গুলো তথা বিশ্ব মন্দার কথা ক্ষনে ক্ষনে কিছুটা হলেও সামনে নিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমগুলো। বিশ্বের নামিদামি সংবাদ সংস্থা এবং ঐতিহ্যগতভাবে অনেক পুরনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান ২০২৩ সালকে অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক এবং অন্যান্য বিচারে একটি সংকটময় সাল বলে ধরে নিয়ে অনবরত নানারকম গবেষণা পত্র তথ্য উপাত্ত ও পূর্বাভাস প্রকাশ করছে। প্রকাশিত গবেষণার ফলাফল কে কেন্দ্র করে প্রতিবেদন করছে হাজারো সংবাদ মাধ্যম। যা ছড়িয়ে পড়ছে লাখো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
বৈশ্বিক অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা নেদারল্যান্ডস এর আর্মস্টিংভিনে প্রতিষ্ঠিত এবং বর্তমানে বেসরকারি অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা কেপিএমজি ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড সংস্থাটি অক্টোবর মাসের তৃতীয় সাপ্তাহিক পশ্চিমা বিশ্বে বিশেষত আমেরিকার খ্যাতনামা বাণিজ্যিক সংস্থার কর্ণধার এক্সিকিউটিভ অফিসারদের সিইও এদের সঙ্গে ২০২৩ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করে। জরিপ পরিচালনা করে এবং এর ফলে উঠে আসা তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায় এসব স্বনামধন্য সি ইউ এর মধ্যে আমেরিকার শতকরা ৯১ জন এবং বিশ্বব্যাপী শতকরা 86 জন মনে করেন যে আগামী ১২ মাসের মধ্যেই পৃথিবীতে একটি বড় অর্থনৈতিক দুর্যোগ নামতে যাচ্ছে।
বিশ্লেষন
আশঙ্কা থেকে কয়েকজন নামি দামি সিইও নিজ নিজ কোম্পানির কর্মী ছটায় এবং নতুন কর্মী না নেওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন। আমেরিকার নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক মূলত অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্বখ্যাত সাময়িকী দ্যা ওয়ার্ল্ড স্ট্রিড জার্নাল এর অর্থনৈতিক রিপোর্টার হেরিএ টরি এবং ডাটা নিউজ এডিটর অ্যান্থনিটি বারোসের লিখা একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় গত ১৬ অক্টোবর। এই গবেষকের মতে উচ্চমাত্রার মুদ্রাস্ফীতি অর্থনৈতিক সংকোচন এবং ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাই এর প্রেক্ষাপটে আগামী বারো মাসের মধ্যে আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেবে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয় নানা অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা উকি দিলেও ২০২০ সালের পর এই সম্ভাবনা 50 শতাংশের নিচেই ছিল। আমেরিকার নিউইয়র্ক ভিত্তিক অর্থনীতি বিষয়ক থিম ট্যাংক ব্লুম্বার ১৭ অক্টোবর 2022 তারিখে প্রকাশ করে প্রতিবেদন। তার মতে এক বছরের মধ্যে আমেরিকার অর্থনৈতিক ধ্বস নামার সম্ভাবনা ১০০%। যার সে দেশের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জন্য একটি দুঃসংবাদ। আর নভেম্বরে নির্ধারিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি একটি বড় আঘাত। পূর্ববর্তী গবেষণায় এমন মন্দার সম্ভাবনা ছিল 65%। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসের মধ্যে এমন মন্দার সম্ভাবনা শতভাগ।
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ৪২ জন বিশেষজ্ঞের মতামত ও জরিপের ভিত্তিতেও ধারণা করছে যে আগামী ১২ মাসের মধ্যে আর্থিং মন্দার সম্ভাবনা ৬২ শতাংশ যা একমাস আগেও ছিল 50 শতাংশ। সামষ্টিক অর্থনীতির ১৩ টি উপাদান এবং অর্থনীতি ও পুঁজি প্রবাহের অন্যান্য সুচকের ভিত্তিতে এই আশঙ্কা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও তার দলের আর্থিক সক্ষমতার চিত্রকে বড় প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। কাতার ভিত্তিক মিডিয়া হাউজ আল জাজিরার সিনিয়র বিজনেস প্রডিউসার ওভারের লেখা একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ১০ অক্টোবর ২০২২ তারিখে। এই প্রতিবেদনে নিউইয়র্ক ভিত্তিক বৈদেশিক মুদ্রা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক এডওয়ার মুয়ার্ড বরাতে লেখা হয় দ্রব্যমূলের উর্ধগতির ফলে জনজীবন সৃষ্ট চাপ সহজে দূরীভূত হবে না।

0 মন্তব্যসমূহ